'নীলদাহন' উপন্যাস থেকে [প্রকাশিতব্য] • পর্ব-১

'নীলদাহন' উপন্যাস [প্রকাশিতব্য] থেকে | পর্ব-১

নীল চাষ ও নীল বিদ্রোহের ইতিহাসকে উপজীব্য করে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে চরিত কথাসাহিত্যিক সাঈদ আজাদ-এর প্রকাশিতব্য উপন্যাস নীলদাহন

পরিপক্ব নীলের গাছ কাটা হয় মুলত দুই মৌসুমে।
বর্ষাকালে যে নীল কাটা হয়, সেই নীলকে বলা হয় চৈতি নীল। চৈত্র মাসে বপন করা হয় বলেই এই নীলকে চৈতি নীল বলে। সাধারণত চৈত্র মাসের দিকে প্রথম বৃষ্টির পরপরই এই নীলের বীজ বপন করা হয়। এই সময়টা নীল চাষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চৈতি নীল কাটা শুরু হয় আষাঢ় মাসের দিকে। যখন নদী-নালা, খাল-বিল পানিতে ভরে উঠতে শুরু করে, তখনই চৈতি নীল গাছ কাটার উপযুক্ত সময়। বৃষ্টির পানিতে নীলের গাছ দ্রুত বাড়ে এবং এই সময়ের গাছ থেকে নীলও পরিমাণে বেশি পাওয়া যায়। নদীপথে চলাচল করতে সুবিধা হয় বলে এই সময়ে কর্তিত নীলের গাছ পরিবহণ করে সহজে কারখানায় নিয়ে যাওয়া যায়।
বসন্তকালে যে নীল কাটা হয়, সেই নীল হলো কার্তিকী নীল। সাধারণত কার্তিক মাসের দিকে যখন জমির পানি নেমে যায়, তখন আর্দ্র মাটিতে কার্তিকী নীলের বীজ বপন করা হয়। নীলের গাছ কাটা হয় ফাল্গুন মাসের দিকে। এই সময়ের নীলের মান খুব ভালো হয়। তবে ফলন হয় চৈতি নীলের তুলনায় কম। আবার খরা বা আগাম গরম পড়লে এই নীল নষ্ট হওয়ার ভয়ও থাকে।
চাষিদের সাথে নীলকর বা লাঠিয়ালদের সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষ হয় চৈতি নীলের মৌসুমে। কেননা, আউশ ধান এবং নীল দুই ফসলেরই এই সময়ে চাষ শুরু করতে হয়। এই সময় নীলকররা জোর করে জমিতে ধান করতে না দিয়ে নীলের বীজ বপন করায় চাষীদের দিয়ে। আর চাষীরা চায়, এই সময়ে জমিতে আউশ ধান বুনতে- যাতে ভাদ্র মাসের অভাবের সময় তাদের ঘরে খাবার থাকে। ... প্রথমে ধান করবে না নীল করবে, এই নিয়ে বর্ষার শুরুতে প্রায়ই চাষীদের সাথে কুঠির লোকদের সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষে ক্ষয়ক্ষতি হয় চাষীদেরই। তারা কুঠির লাঠিয়ালদের সাথে পেরে উঠে না। বাধ্য হয় নীলের বীজ বুনতে।
আমিনরা এসেছে চৈতি নীল কাটতে।
চলতি মৌসুমে জ্যৈষ্ঠ মাস শেষ হতে না হতেই চারদিকে চৈতি নীল কাটার হিড়িক পড়ে গেছে। মাঠের পর মাঠ যে দিকেই চোখ যায়- শুধু নীলের গাছ। নীল গাছ দেখতে অনেকটা অড়হড় গাছের মতো। তবে নীলের পাতা অপেক্ষাকৃত ছোট, গাছও আরো খাটো। পাতা চির হরিৎ, নীল চাষের জন্য উষ্ণ আবহাওয়া প্রয়োজন। সে কারণে বাংলার প্রায় সব অঞ্চলই নীল চাষের জন্য উপযোগী। তন্মধ্যে নদীয়া যশোর অঞ্চলে সর্বাধিক ভালো নীল হয়। যে কারণে এই অঞ্চলে অগণিত নীল কুঠি স্থাপিত হয়েছে।
আমিররা নীল কাটার জন্য বাড়ি থেকে যখন বের হয়েছে, তখন চারপাশ সবেমাত্র ফর্সা হতে শুরু করেছে। আজ বৃষ্টি নেই, তবে আকাশ মেঘলা। আমিররা অভিজ্ঞ কৃষক, সব মেঘে যে বৃষ্টি হয় না, তারা তা জানে।... মেঘলা আকাশ, কিন্তু বৃষ্টি নেই- এমন সকালই হলো নীল গাছ কাটার উৎকৃষ্ট সময়।
কমবেশি একশ থেকে একশ বিশ দিনের মধ্যেই নীলের গাছ কাটার উপযুক্ত হয়ে যায়। গাছগুলো এখন তিন থেকে সাড়ে তিন হাতের মতো লম্বা হয়েছে। পাতাগুলো যথাযথ পরিপক্ব হয়ে গাঢ় সবুজ বর্ণ ধারণ করেছে। পাতা ছিঁড়ে দুই আঙ্গুলে চটকালে আঠালো ভাব পারিলক্ষিত হয়। বোঝা যাচ্ছে, গাছ রসে ভরপুর এখন। তাছাড়া গাছে গাছে লালচে-বেগুনি রঙের কুঁড়িও উঁকি দিচ্ছে। গাছ কাটতে আর দুই চার দিন দেরি করলেই নীলের ফুল ফুটতে শুরু করবে। তখন নীলের গুণাগুণ কমতে শুরু করবে। আর বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলে তো সর্বনাশই! পাতার সব নীল ধুয়ে যাবে বৃষ্টির পানির সাথে। এর মধ্যেই বেশ কদিন ঝড়-বৃষ্টি হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে অপেক্ষাকৃত নিচু জমিনগুলোতে হালকা পানি জমতে শুরু করেছে।
ক্ষেতে পৌঁছে আমিরা একটু সময় নষ্ট করে না। কাস্তে দিয়ে নীলের গাছ কাটতে শুরু করে।
জমির সমস্ত নীল কেটে শেষ করতে করতে বেশ বেলা হয়ে যায়। সাথে নিয়ে আসা ছাতু পানিতে গুলে খেতে বসে চারজন। সতীশ আর রতন অন্য দুইজনের কাছ থেকে একটু দূরে গিয়ে বসে। চলাফেরা-উঠাবসা থাকলেও খাওয়ার সময়টাতে সতীশরা মুসলিমদের কাছ থেকে একটু দূরত্বই বজায় রাখে। জলও খায় ওরা আলাদা পাত্রে। আমিনরা এমন আচরণে অভ্যস্ত। সতীশরা দূরে চলে যাওয়াতে তারা কিছু মনে করে না।
কাজিপুর গ্রামটা মূলত মুসলিম প্রধান। শাহিজীল পরগনার এই গ্রামটির জমিদারও মুসলিম। তবে বেশ কয়েক ঘর হিন্দুও আছে এই গ্রামে। বহুদিন থেকেই এখানে দুই ধর্মের লোক পাশাপাশি বাস করে। কোনকালেই কোন কিছু নিয়ে তাদের মধ্যে ফ্যাসাদ-ঝগড়া হয়নি। সতীশ-আমিনরা জন্ম থেকে এক সাথেই বড় হয়ে উঠেছে। ধর্মপালন আর খাওয়ার সময়টা ছাড়া তাদের আচরণে তেমন পার্থক্য করা যায় না।
দ্রুতই খাওয়া শেষ করে সবাই। এখন আয়েশ করে খাওয়ার সময় নেই। নীলের গাছ কারখানায় পৌঁছাতে দেরি করা যাবে না। স্তুপ করে রাখা নীলের গাছ নৌকায় তুলতে থাকে ওরা। কারখানায় পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর গড়িয়ে যাবে। আজকে গাছ কাটতে দেরি হয়ে গেছে ওদের। কারখানায় গেলে কথা শুনতে হবে। আসলে জমির তুলনায় লোক কম হয়ে গেছে, সে কারণেই দেরি হলো।
লোকালয় থেকে বেশ কিছুটা দূরে, চারপাশে অনেকখানি খোলা জমি আর কাছেই পানির সহজ যোগান আছে- এমন সব জায়গাতেই নীলের কারখানাগুলো গড়ে উঠেছে। নীল তৈরিতে প্রয়োজন হয় প্রচুর স্বচ্ছ পানি। সেই সাথে নীলের গাছ পরিবহন, পরে উৎপাদিত নীল কলকাতায় নীলামের জন্য পাঠাতেও জলপথই ভরসা। কাজেই নীলের কারখানাগুলো কেন যে নদীর পাড়ে পাড়ে, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
কুতুবপুর নীল কারখানাটি কাজলা নদীর পাড়ে। কাজলার উজানে উজানে আরো আটটি নীল উৎপাদনের কারখানা আছে। একটা আছে আমঝুপি কুঠি প্রাঙ্গনে। আমঝুপি নীলকুঠির অধীনে সর্বমোট দশটি কারখানা থাকলেও কুতুবপুরে কারখানটিই সবচেয়ে বড়। এই কারখানায় শাহিজীল পরগনার অর্ন্তগত সমস্ত জমির নীলের গাছ আনা হয় কাঁচামাল হিসেবে। সাধারণত ছোট কারখানাগুলোতে ছয় জোরা এবং বড় কারখানাগুলো বারো থেকে চৌদ্দ জোড়া চৌবাচ্চা থাকে। কুতুবপুর কারখানাটিতে চৌবাচ্চা আছে পনেরো জোড়া। এই কারখানায় নদীপথে যেমন গাছ আনা যায়, তেমনি স্থলপথে গরুর গাড়িতেও আনা যায়।
কুতুবপুর নীল কারখানায় উৎপাদিত নীল শুধু যে পরিমাণে বেশি হয় তাই নয়, মানেও উৎকৃষ্ট হয়ে থাকে। সেজন্য এই কারখানাটির প্রতি নীলকর ফার্গুসনের বিশেষ নজর থাকে। নীলের মৌসুমে আমঝুপি কুঠির ছোট সাহেব ম্যাকফারসনকে প্রায়শই এই কারখানায় আসতে হয়। নীল গাছ কারখানায় আনা থেকে শুরু করে একেবারে নৌকাযোগে নীলের বার বা শুকনো নীল কলকাতায় পাঠানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই খুব সতর্কতার সাথে খেয়াল রেখে, পরীক্ষা করে করে তবেই নীল তৈরির প্রক্রিয়া সমাপ্ত করতে হয়। তারপর সেই নীল থেকে মূনাফার আশা। কোন একটি ধাপে অসর্তক হলেই নীল নষ্ট হয়ে যায়। তদারকিতে ঢিল দিলে, নীলের মান যেমন পড়ে যায়, তেমনি উৎপাদনও হয় কম।
ম্যাকফারসন সাহেব কদিন ধরেই নীলের কারখানাগুলোতে যাতায়াত করছেন। তবে তিনি বেশি তদারকি করেন কুতুবপুর কারখানাটিই। আজও তিনি এসেছেন এই কারখানাতে। সূর্য একটু মাথার উপর উঠতেই গরুর গাড়ি আর নৌকা বোঝাই করে নীলের গাছ আসছে কারখানাতে।... গতকালও প্রচুর গাছ এসেছিল কারখানায়। সামনে পনেরো দিন ধরে নীলের গাছ আসতেই থাকবে সকাল থেকে দুপুর অব্দি। এখনই তো কারখানায় গাছ আসার মৌসুম।... কারখানায় গাছ আসামাত্রই কাজ শুরু করে দিতে হয়। ফেলে রাখলেই আর অই গাছ থেকে নীলের আশা করা যায় না।
কারখানায় বিরাট কর্মযজ্ঞই হচ্ছে বলা যায়। কুলিদের হাকাহাকি... কৃষকদের আসা-যাওয়া, কর্মচারীদের চিৎকার- কারখানা একেবারে জীবন্ত হয়ে উঠছে।
নীলের গাছ কারখানায় পৌঁছামাত্র লম্বা-চওড়া ওজনদার লোকটা লোহার চেইনে আঁটি বাঁধার মতো করে বেঁধে নীলের গাছগুলো মেপে নিচ্ছে। ম্যাকফারসন সাহেব তীক্ষ্মদৃষ্টিতে লোকটার কাজ দেখতে থাকেন। তিনি জানেন, লোহার শেকলের দৈর্ঘ্য ছয় ফুট। ওজানদার লোকটা বজ্জাত আছে। কোন কোন চাষীর কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে সে মাপে কমবেশি করে। গাছ বেশি নিলে তো কারখানার লাভই। কিন্তু সে টাকা খেয়ে লোহার শিকলে ঢিল দিয়ে অল্প নীলের গাছেই এক আঁটি মেপে নেয়। এতে তারও লাভ, চাষীরও লাভ। লোকসান কারখানার। আজকেও সে কারো কারো কাছ থেকে দুই আনা নিয়ে আঁটি বাধছে শেকলে ঢিল দিয়ে। দেখে ক্রোধে সারা শরীর কেঁপে উঠেছে ম্যাকফারসনের। বাঞ্চতের কত বড় সাহস, তাঁর উপস্থিতিতে চুরি করে! ম্যাকফারসন কারখানায় না থাকলে না জানি কেমন ডাকাতি করে। একবার তাঁর মনে হয়, হাতে ধরা চাবুক দিয়ে পিটিয়ে শালা-বাঞ্চতের শরীর ফাটিয়ে ফেলতে। তবে রাগটা তিনি সংবরণ করেন। ... একবার করেছে করেছে, আরেকবার করলে আর ছাড় দিবেন না। শ্যামচাঁদ দিয়ে চাবকে পিঠের চামড়া তুলে লবণ লাগিয়ে দিতে হবে। ভাবতে ভাবতেই রাগটা পড়ে যায় ম্যাকফারসনের।... থাকগে, দুই আঁটিতে আর কত পেয়েছে হারামির পুত। তারও তো বেঁচে থাকতে হবে।
নীলের কারখানায় কাজের তুলনায় মজুরি তো কমই। তাও কোন্ কোন্ রাজ্য থেকে বুনো-কুলিদের আনা গেছে বলেই না কারখানার কাজ ঠিকঠাক মতো চলছে। তাছাড়া এরা মাঝে-মধ্যে টুকটাক চুরি করলেও কাজে দক্ষ আছে। ওজনদার কুলিটা চাষীগুলোকে বেশ ধমকে, গালি দিয়ে, দ্রুততার সাথেই গাছ মেপে নিচ্ছে। ম্যাকফাসন কাছে গিয়ে, কুলিটাকে চোখ দিয়ে বিশেষ ইঙ্গিত করে। কুলিটা তাঁর ইঙ্গিত বুঝতে পারে। এখন সে শেকলে ঢিল না দিয়ে বরং খুব আঁটসাঁটো করে নীলের গাছ বাঁধবে। এতে আগের করা চুরি পুষিয়ে যাবে ভালো মতোই।
মেপে রাখা গাছ একপাশে রাখা মাত্রই, অন্যান্য কুলিরা সেগুলো টেনে নিয়ে জোড়া চৌবাচ্চার উপরেরটাতে সাজিয়ে রাখছে।
রাতেই চীনা পাম্প দিয়ে কাজলার জল তুলে বড় জলাধারটা কানায় কানায় ভর্তি করে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে নালার সাহায্যে উপরের চৌবাচ্চাটায় পানি ভরা হচ্ছে। জলের উপর গাছগুলো যেন ভেসে না থাকে সেজন্য এক দল কুলি বিশেষভাবে তৈরি বাঁশের সাহায্যে সেগুলো চেপে পানির ভিতরে ঠেসে তার উপর ভারী ভারী তক্তা দিয়ে চেপে রাখছে। এভাবে নীলের গাছগুলো পানির মধ্যে থাকবে আট-দশ ঘন্টার মতো। তাতে করে গাছগুলো গেঁজিয়ে উঠবে ঠিকঠাক।
গতকালের চারটা চৌবাচ্চায় এভাবে গেঁজিয়ে উঠার জন্য নীলের গাছ কাজলার স্বচ্ছ জলে ঢুবিয়ে রাখা হয়েছে। সেগুলো আজকে পরীক্ষা করে, তাপমাত্রা মেপে দেখার জন্যই আজ সকাল সকাল কারখানায় এসেছেন ম্যাকফারশন। গাছ গেঁজানোর জন্য তাপমাত্রা ঠিকঠাক মতো হলো কিনা, দেখার জন্য ঘোড়া থেকে নেমে প্যান্টের পকেট থেকে থার্মোমিটার বের করেন তিনি।
উপরে উপরে দেখা যাচ্ছে, নীলের গাছ ঠিকঠাক গেঁজিয়েছে। পানির উপরে গাঢ় সবুজ-হলদেটে রঙের ফেনাও জমে উঠেছে। এখন তাপমাত্রা ঠিক থাকলেই হলো। থার্মোমিটার পানিতে চুবিয়ে মনটা ভালো হয়ে যায় ম্যকফারসনের। নাহ, পানির তাপমাত্রা যথাযথই আছে। এই পানি থেকে উৎকৃষ্ট নীলই মিলবে।
কুলিরা জানে এরপর কী হবে। তারা ম্যাকফারসনের দিকেই তাকিয়ে আছে। তিনি তাদের ইশারা করেন, চৌবাচ্চার ছিপি খুলে দিতে। তারা তৎক্ষণাৎ ছিপি খুলে দেয়। দেখতে দেখতে চারটা চৌবাচ্চার পানি নিচে জোড়ার চৌবাচ্চায় চলে যায়। এই পানি খুবই মূল্যবান। এই পানি থেকেই তৈরি হবে কাঙ্খিত সেই নীলের বার। যে বার কলকাতা হয়ে চলে যাবে ইউরোপে।
নীল তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ শ্রমসাধ্য এবং পদ্ধতিগত ভাবেও বেশ জটিল। মূলত এটি একটি রাসায়নিক পচন ও থিতানো প্রক্রিয়া, যা বড় বড় ইটের চৌবাচ্চার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। কাজ চলে বিভিন্ন স্তরে। সব জায়গাতেই কাজ অনুযায়ী দক্ষ লোক রাখা আছে। তবুও ম্যাকফারসন ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে ঘুরে কাজ দেখতে থাকেন। নীলের মৌসুমে কারখানাগুলোতে মাঝে মাঝে নীলকর সাহেব বা স্বয়ং কোম্পনির মালিকও আসেন। তৈরিকৃত নীলের বার দেখে তাঁরা সন্তুষ্ট হলেই সেই বার নৌকায় তোলা হয় কলকাতায় পাঠানোর জন্য। কলকাতা থেকে থেকে জাহাজে করে নীলের বার চলে যায় ইউরোপে।
সদ্য গেঁজানো জল নিচের চৌবাচ্চায় পৌঁছতেই দশ-বারো জন শ্রমিক বাঁশের লাঠি হাতে জলে লাফিয়ে পড়ে। বুক সমান পানিতে নেমে তারা লাফালাফি শুরু করে। সেই সাথে লাঠি দিয়ে চৌবাচ্চার জলে অনবরত ঘুর্ণন সৃষ্টি করতে থাকে তারা। শ্রমিককের কেউ কাজে একটু ঢিল দিলেই কাছে দাঁড়িয়ে থাকা তাকিদগির কড়া গলায় হাঁক দিচ্ছে, হাত চালা! নাড়ানিতে ঢিল তিবি তো পিঠের চামড়া থাকবে না।... তাকিদগিরের হাঁকে কাজ হয়। শ্রমিকরা ঢিলেমি বাদ দিয়ে আরো তেজের সাথে লাঠি ঘুরাতে থাকে। সেই সাথে সমবেত স্বরে গান ধরে তারা। গানে তারা এক ধরনের উদ্দীপনা পায়। তাদের কাজের গতি বাড়ে।
দেখতে দেখতে চৌবাচ্চার জলের উপরে ফেনা জমতে শুরু করে। এভাবে নাড়াচাড়ার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, বাতাসের অক্সিজেনের সাথে জলের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটুানো। দুই থেকে তিন ঘন্টা শ্রমিকরা এভাবেই জল নাড়াচাড়া করবে। আসলে যতক্ষণ পর্যন্ত না জলের রঙ সবুজ থেকে ধীরে ধীরে গাঢ় নীল বর্ণ ধারন করতে শুরু করে ততক্ষণ পর্যন্তই এরা লাঠি দিয়ে পানিতে ঘুর্ণণ অব্যহত রাখবে। সেই সাথে লাফালাফি তো আছেই। অনবরত লাফালাফির ফলে শ্রমিক লোকগুলোর গায়ের রঙ নীল হতে শুরু করেছে। ক্লান্তও হয়ে পড়েছে কেউ কেউ। কিন্তু এখন চৌবাচ্চা থেকে উঠে পড়া যাবে না। নীলগাছের নির্যাস মিশ্রিত জল যত বেশি নাড়াচাড়া হবে, বাতাসের অক্সিজেন তত বেশি পানির সাথে মিশবে, তত দ্রুতই নীলও জমাট বাঁধবে।
নির্দিষ্টি সময় পার হলে পানির সাথে মিশে থাকা নীলের কণা জমাট হয়ে দানা বাঁধতে শুরু করবে। কিন্তু তখনও শ্রমিকের পানি থেকে উঠতে দেওয়া হবে না। অভিজ্ঞ কালারম্যান চৌবাচ্চা থেকে সামান্য পানি সাদা পাথরের থালায় নিয়ে পরীক্ষা করে দেখবে। যদি দেখা যায়, নীলের দানাগুলো দ্রুত পানির নিচে বালির মতো থিতিয়ে পড়ছে এবং উপরের পানি পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে, তবেই নাড়ানি বন্ধ হবে। ... এই কাজটা মাঝে মাঝে ম্যাকফারসনও করেন। উপরের পানি একটুও ঘোলাটে থাকা মানে পানির নীল সম্পূর্ণ আলাদা হয়নি। নীল আলাদা হওয়া পর্যন্ত শ্রমিকদের পানি নাড়িয়ে ঘূর্ণণ তৈরি করে যেতে হবে। সাধারণত দুই থেকে তিন ঘন্টা বিরামহীন লাঠি চালানোর পর শ্রমিকরা চৌবাচ্চা থেকে উঠার অনুমতি পাবে। ততক্ষণে উপরের পানি স্বচ্ছ হতে শুরু করবে। খালি চোখে দেখেই বুঝা যাবে, পানির সাথে আর নীল নেই। শ্রমিকরা পানি থেকে উঠার কিছুক্ষণ পরই পানি থিতিয়ে নীলের দানাগুলো চৌবাচ্চার তলদেশে জমা হতে থাকবে। এভাবে জল স্থির হয়ে চার থেকে পাঁচ ঘন্টা থাকার পর, নীলের সমস্ত দানা থিতিয়ে চৌবাচ্চায় নিচে কাদার মতো একটা স্তর হয়।
চারপাশে অত্যন্ত তীব্র উৎকট একটা গন্ধ ছড়িয়ে আছে। পচা নীলের গন্ধ। গন্ধে মাঝে মাঝে দমবন্ধ হয়ে আসছে ম্যাকফারসনের। কুলি আর চাষীগুলো কী করে ঘন্টার পর ঘন্টা এখানে দাঁড়িয়ে থাকে কে জানে! চৌবাচ্চায় কাজ করতে করতে লোকগুলোর শরীর নীলের রঙে নীল হয়ে গেছে। কারখানায় বেশিদিন কাজ করলে নীলের রাসায়নিক প্রভাবে এদের অনেকের চামড়ায় রোগ হয়, জানেন তিনি। রোগ বেশি ছড়ালে তাদের কারখানা থেকে নিয়ে নীলচাষের কাজে লাগানো হয়।
ভ্যাপসা গরম আর নীল পচা গন্ধে হাঁসফাস লাগছে ম্যাকফানসনের। কিন্তু চৌবাচ্চার নিকট থেকে এখনি সরে যাওয়া ঠিক হবে না। কারখানায় নীল গাছ আনার পর চৌবাচ্চা থেকেই মূলত উৎকৃষ্ট নীলের যাত্রা শুরু হয়। এখানে ফাঁকি দেওয়া হলে কিছুতেই আরো ভালো নীল, যাকে বলে ‘কপার গ্লস নীল’- সেটা পাওয়া যাবে না। অবশ্য শ্রমিকগুলো সর্বোচ্চটা দিয়েই পরিশ্রম করে যাচ্ছে। ...দেশীয় শ্রমিকগুলোর জন্য মাঝে মাঝে মায়াই হয় তাঁর। এক এক জন কীভাবে এত পারিশ্রম করতে পারে! কিন্তু মায়া-দয়া দেখানোর তো উপায় নেই আসলে। গেঁজানো জল অনবরত না নাড়লে তো জল থেকে নীলের কণা আলাদা হবে না। মাঝখানে বিরতি দিলে কাজটা আধা খেচরা হয়ে নীল নষ্ট হয়ে যাবে। আর নতুন নীলের গাছও ফেলে রাখার উপায় নেই। অতএব শ্রমিকদের একটানা কাজ করেই যেতে হবে।
ম্যাকফারসন ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে বয়লার হাউসের দিকে যেতে থাকেন। তাঁর পেছনে পেছনে দুজন লাঠিয়াল যেতে থাকে।
উপরে স্বচ্ছ জল ফেলে দিলে চৌবাচ্চার তলে পড়ে থাকে নীল কাদা বা কাই। কুঠির ভাষায় একে বলা হয় ‘নীল মাল’।...পাশের চৌবাচ্চায় নীল মাল জমে আছে। সেখান থেকে একদল শ্রমিক অত্যন্ত পিচ্ছিল নীল মাল বড় বড় বালতি করে নিয়ে যাচ্ছে কারখানার আরেকপাশে বয়লার হাউসে। সেখানে নীলের ক্বাথ বড় বড় তামার পাত্রে সেদ্ধ করা হচ্ছে। সেদ্ধ করার ফলে নীলের ভেতরে থাকা ছোটছোট পোকামাকড় বা অশুদ্ধি- সব কিছু নষ্ট হয়ে যায়। ঠিক মতো সেদ্ধ না হলে নীল অল্প দিনেই পচে যায় বা তাতে ছত্রাক ধরে। আবার বেশি সিদ্ধ হয়ে গেলে নীল পুড়ে যায় বা কালচে রঙের হয়ে যায়। তাহলে আবার নীলের বাজার মূল্য কমে যাবে। সে কারণে এই প্রক্রিয়াটিও খুব সর্তকতার সাথে তদারকি করতে হয়। ...পাত্রের কাইটি যতক্ষণ না ক্ষীরের মতো ঘন হয়ে আসে এবং এর উপরিভাগে একটি বিশেষ উজ্জ্বল আভা দেখা যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত জ্বাল চলতে থাকে। এতে প্রায় দুই তিন ঘন্টা সময় লাগে। বয়লার হাউসে অনেকগুলো তামার পাত্রে সকাল থেকেই কাই জ্বাল দেওয়া হচ্ছে।
যেসব পাত্রের কাই ঘন এবং উজ্জ্বল হয়ে গেছে, একদল শ্রমিক সেই পাত্রের কাই থেকে জল ঝরানোর জন্য সেগুলো বড় বড় কাঠের ফ্রেমের উপর বিছানো মোটা সুতি কাপড়ের উপর নিয়ে ফেলছে। সুতির কাপড়টি ছাঁকনি হিসেবে কাজ করে।
ফ্রেমের উপর, সুতি কাপড়ে নির্দিষ্ট সময় রাখার পর ছাঁকা নীলকাইগুলো শ্রমিকরা বর্গাকার কাঠের ছাঁচে নিয়ে ফেলছে এখন। ছাঁচগুলো কানায় কানায় ভরে উঠতেই বিশাল লোহার স্ক্রু-প্রেস দিয়ে উপর থেকে বাক্সের উপর প্রচন্ড চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। ক্রমাগত চাপের কারণে নীল ক্বাথের ভেতরে থাকা শেষবিন্দু পানিও নিংড়ে বের হয়ে যাবে। এভাবে কয়েক ঘন্টা চাপে রাখার ফলে পানি বের হয়ে নীলের ক্বাথ শক্ত ব্লক বা সাবানের আকার ধারণ করবে। ছাঁচ থেকে সাবধানে নীলের ব্লক বের করে অভিজ্ঞ শ্রমিকরা সেগুলোকে তিন ইঞ্চি বাই তিন ইঞ্চি মাপের ছোট ছোট বর্গাকার কেকের আকারে কাটবে। একে বলা হয় ‘ইন্ডিগো কেক’- নীল কেক। ...এরপর ভেজা কেকগুলো নিয়ে যাওয়া হয় কারখানার আরেক পাশের শুকানোর ঘর বা ড্রাই হাউসে। সেখানে কাঠের র্যাকে কেকগুলা সাজিয়ে প্রায় তিনমাস ধরে শুকানো হয়। শুকানোর ঘরগুলো এমন স্থানে তৈরি করা হয়েছে যাতে ঘরে রোদ না আসে কিন্তু বাতাস ঠিক মতোই চলাচল করতে পারে। এভাবে মাস তিনের পর থাকার পর নীলের ভেতকার পানি সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়।
ম্যাকফারসন ড্রাই হাউসের দিকে এগিয়ে যান। নিজের চোখে সব না দেখলে হবে না। শ্রমিক-কুলিরা ভালোই খাটে, বেশিরভাগই বিশ্বস্তও। তাহলেও তাদের সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারেন না তিনি। তেমন সুযোগ পেলে এরা ফাঁকি দিবেই।... বিশাল ঘরটাতে সার সার শুকাচ্ছে হাজার হাজার নীলের কেক। ম্যাকফারসন একটা কেক হাতে নিয়ে, নাকের কাছে ধরে অনেকক্ষণ ধরে গন্ধ নেন। কেমন একটা মিষ্টি গন্ধ কেকটাতে!... কেকের গায়ে আঙ্গুল দিয়ে ঘষা দেন ম্যাকফারসন। ঘষা দিতেই অদ্ভূত এক রকমের লালচে-সোনালী-তামাটে আভা ঝিলিক দিয়ে উঠে। এ হলো ‘কপার গ্লস‘। তামাটে আভা! তার মানে এই চালানের নীল ‘কপার গ্রেডের’! নীলের সেরা ক্যাটাগরি এটিই। কপার গ্লস আছে মানে নীল সঠিকভাবে সেদ্ধ হয়েছে এবং নীলে কোন জলীয় অংশ নেই। বুঝা যাচ্ছে, তাঁর তদারকিতে কাজ ঠিকঠাক হচ্ছে। শ্রমিকরা ফাঁকি দিতে পারছে না।... তৃপ্তির হাসি ফুটে ম্যাকফারসনের ঠোঁটে। সব কষ্ট শেষে এমন নীল পেলে তবেই সার্থকতা।
ম্যাকফারসন সন্তুষ্টি প্রকাশ করতেই একদল শ্রমিক শুকনো নীলের কেকগুলো নিয়ে কারখানার আরেকটা ঘরে নিয়ে যেতে শুরু করে। সেখানে শুকনো নীলের কেক গুণমান অনুযায়ী বিভক্ত করে, বিশেষ নম্বর খোদাই করা হবে। খোদাই শেষে আরেকদল শ্রমিক সেগুলোর গায়ে কুঠির সিল মেরে কাঠের বাক্সে স্তরে স্তরে সাজিয়ে রাখবে। নীল তারপর গরুর গাড়ি বা নৌকায় করে কলকাতার বন্দরে পাঠানোর জন্য তৈরি।
চারপাশে গেঁজানো-পচানো নীলের উৎকট একটা গন্ধ ভাসছে। গন্ধটা ভালো লাগছিল না ম্যাকফারসনের। তিনি কারখানা থেকে একটু দূরে, শাল গাছের নিচে অস্থায়ী চালার দিকে রওয়ানা হন। বাঁশ আর কাঠ দিয়ে বানানো চালাটার উপরে শণে ছাওয়া। চারপাশ খোলা। মেঝেটা মাটির; উপরে গাছ থাকাতে ছাউনির ভেতরটায় বেশ আরামদায়ক একটা ঠান্ডা আছে। ঘোড়া থেকে নেমে কাঠের চেয়ারে হাত-পা ছড়িয়ে বসেন ম্যাকফারসন। অনেকক্ষণ রোদে থেকে বেশ তৃষ্ণা পেয়েছে।
ম্যাকফারসন লাঠিয়ালদের, সাথে নিয়ে আসা শ্যাম্পেইনের বোতল নিয়ে আসতে বলেন। ছাউনির একপাশে মাটির কলসি আছে। সেখানে আগে থেকেই পানি রাখা। মাটির কলসিতে পানি বাষ্পীভূত হওয়ার কারণে পানি বেশ ঠান্ডা থাকে। মজুরদের একজন কলস থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে শ্যাম্পেইনে মিশিয়ে দিলে তিনি চুমুক দেন।
আহ, গ্লাসে চুমুক দিয়ে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলেন ম্যাকফানসর। কোম্পানির ম্যানেজার তাঁর জন্য বিশেষভাবে এই অমৃত পাঠিয়েছেন কয়েক বোতল। স্বচ্ছ, ঝকঝকে, দারুণ মিষ্টি স্বাদের এই মদিরা এসেছে তাঁর দেশ ফ্রান্সের শ্যাস্পেইন অঞ্চল থেকে। অঞ্চলের নাম অনুসারেই এই পানীয়র নাম শ্যাম্পেইন। ইউরোপের রাজপরিবারগুলোতে শ্যাম্পেইন অত্যন্ত জনিপ্রিয় হয়ে উঠেছে।... তবে এমন প্যাচপ্যাচে কাদা আর ভ্যাপসা গরমের দেশে শ্যাম্পেইন খেয়ে আসলে তেমন শান্তি পাওয়া যায় না। কোথায় ইউরোপ, ঘরের বাইরে বরফ পড়ছে, ভেতরে ফায়ারপ্লেসের আগুন- আর কোথায় চারপাশে উষ্ণ বাতাস, চিটচিটি গরম, শরীর ভর্তি ঘাম! যত ভালো মদই হোক, তা এখানে খেয়ে ততটা শান্তি পাওয়া যায় না।
ইউরোপে বাংলার নীল- বিশেষ করে নদীয়া, যশোরের উৎপাদিত নীলের চাহিদা এখন তুঙ্গে! ম্যাকফারসন এসেছেন ফ্রান্সের লিঁও থেকে। তাঁর ভাবতে ভালো লাগে, বাংলার নীলের চাষ এই যে প্রসার, তার পেছনে রয়েছেন তাঁরই দেশীয় একজন। দেশীয় বলতে একেবারে লিঁওরই অধিবাসী তিনি।
বাংলার মাটি যেন সোনা! এখানে জমিতে নীল বীজ ফেললেই তা অর্থ হয়ে ফেরত আসে। ... সেই কবে আমেরিকা থেকে নীলের বীজ নিয়ে এসে দূরদর্শী লুই বোনার্দ হুগলী নদীর তীরে নীলকুঠি স্থাপন করে, চন্দনগরে নীলের চাষ শুরু করেছিলেন।... ম্যাকফারসন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। চন্দননগরে তখন ছিল তাদেরই উপনিবেশ! চন্দরনগরকে তো স্থানীয় মানুষ এখনো ফরাসডাঙ্গাই বলতো। এখনো বলে। তবে তাদের অধিপত্য আর নেই এখন।
লুই বোনার্দ একে একে মালদহ, যশোর, কালনাতেও নীলের আবাদ করতে থাকেন। তিনি ১৮২০ সালে শুধু কালনা থেকেই দেড় হাজার মণ পরিশোধিত নীল রপ্তানী করে ব্রিটেনের ব্যবসায়ী মহলে হইচই বাধিয়ে ফেলেছিলেন।... তারপরই ইউরোপ-আমেরিকা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে লাভজনক এই ব্যবসাটির নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে। তারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর তৎকালীন গর্ভনর জেনারেলকে অল্প খরচে নীল চাষ করে বিপুল মূনাফার কথা জানিয়ে, এই অঞ্চলে নীলের চাষ ব্যাপকভাবে শুরু করার বিষয়টি অবগত করেন। মূলত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী যখন বাংলার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় তারপর থেকেই কোম্পানিটি এই অঞ্চলের দিকে ভালোভাবে নজর দিতে থাকে। বিশেষ করে বাংলার দিকে। আরো বিশেষভাবে বলতে গেলে বাংলার মাটির দিতে। নীলের প্রস্তাব তারা লুফে নেয়।
ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি নীল চাষে এতটা লাভ সম্ভবত আশা করেনি। কোম্পানিটি দ্রুতই নীলের সমস্ত কারবার নিজের অধিকারে নিয়ে নেয়। কিছু দিন পরেই অবশ্য নীল চাষে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি একক কর্তৃত্ব হারায়; বিশেষত ১৮৩৩ সালের সনদ আইন প্রণয়নের দ্বারা ব্রিটিশ শাসনের কেন্দ্রীয়করণের ফলে ফলে চা, আফিমের সাথে সাথে নীলচাষেও কোম্পনিটির একচেটিয়া অধিকার লোপ পায়।
এদিকে শিল্প বিল্পব তখন তুঙ্গে। এ যেন মেঘ না চাইতেই জল! বিপ্লবের সুফল স্বরূপ হাতের বদলে মেশিনে তৈরি হতে থাকে কাপড়। গ্রেট বিটেনে বস্ত্রশিল্পের বিকাশ ঘটে দ্রততার সাথে। প্রস্তুতকৃত কাপড়ে রং করার জন্য নীলের চাহিদাও হঠাৎ করেই হয়ে উঠে আকাশচুম্বী। ইউরোপের সুন্দরী রমণীরা নীল রঙের আভিজাত্যে আরো রমণীয় হয়ে উঠতে থাকে।
বস্ত্রশিল্পের বিকাশের সাথে সাথে নীল নিয়ে কেমন একটা হুলুস্থুল লেগে যায়! নীলের কারবার দ্রুতই এতটা লাভজনক হয়ে উঠে যে- সরকারি কর্মচারী, আমলা, ব্যবসায়ী, জমিদার, রাজনীতিবিদ- এক কথায় টাকা, জমি আর প্রভাবওয়ালা সকলেই ব্যক্তিগতভাবে বা যৌথভাবে নীল ব্যবসায় যাকে বলে একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
দেখতে দেখতে মোটামুটি বিশ বছরের ব্যবধানেই যশোর, নদীয়া, রাজশাহী, খুলনা, মালদহ, চব্বিশ পরগনা, বগুড়া, নাটোর, পাবনা, ঢাকা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, বরিশাল- মোটের হিসাবে সারা বাংলায় ব্যাপক হারে নীলের চাষ শুরু হয়। এবং এসব জেলার অসংখ্য নীলকুঠি কুঠি গড়ে উঠে। কুঠির অধীনে নদীর তীরে তীরে স্থাপিত হয় অসংখ্য নীল প্রক্রিয়াজতকরণ কারখানা।
নীল চাষ করে যে রাতারাতি টাকা-পয়সার মালিক হওয়া যায়, সে কথা বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ে। আর কে না জানে, মৌমাছি যেমন মধুর সন্ধানে ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ায়, তেমনি ব্যবসায়ীরাও বিনিয়োগের সুযোগ-সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। কোথায় টাকা খাটালে মূনাফাসহ ফেরত আসতে পারে, সে সম্পর্কে তারা ভালোই ওয়াকিবহাল থাকে। মধুর সন্ধান পেয়েই একে একে বাংলায় আসতে শুরু করে ইংরেজ, ফরাসি, ডাচ, দিনেমার প্রভূতি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীও। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে নীলের মত আর কোন পণ্য এত দ্রুত ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি বিশ্বব্যাপী।
আর সব ব্যবসায়ীদের সাথেই ম্যাফারসনেরও বাংলায় দেশে আসা। যদিও তিনি ব্যবসা নয়, চাকরি করতেই এসেছেন। কারণ তাঁর অত টাকা নেই, যে জমি লিজ নিয়ে ব্যবসা করবেন। আসার আগে নীলের ইতিহাস ভালোমতোই জেনে এসেছেন তিনি। জেনে এসেছেন এদেশের মানুষ, তাদের সংস্কৃতি সম্পের্কেও। বাংলার মানুষজনকে তাঁর ঠিক পছন্দ হয় না অবশ্য। অধনগ্ন দেহ, ময়লা পোষাক আর কালো কালো লোকগুলোকে পছন্দ করার কোন কারণও খুঁজে পান না তিনি। তবে আর যাই হোক, এদেশের মানুষ খাটতে পারে খুব। একবারে মুখে রক্ত উঠা পর্যন্ত খাটতে পারে এরা। ...ভাবতে ভাবতে ম্যাকফারসন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। সোফিয়া বোধকরি নীলের রঙে রাঙানো পোষাক পরেই তাঁর ফেরার দিন গুণছে। নীল রঙ সোফিয়ার খুব পছন্দ। আহা, কত দিন কত মাস কত বছর মেয়েটার মুখ দেখা হয় না।... সোফিয়া তাঁর প্রেমিকা... সোফিয়ার কথা ভাবতে ভাবতে আরেকটা মুখ ভেসে উঠে তাঁর চোখে। সেই মেয়েটা আছে কুঠিতে। তার চেহারায় কোথায় যেন সোফিয়ার সাথে মিল রয়েছে। বয়সটাও সোফিয়ার কাছাকাছি। মেয়েটা এই অঞ্চলের মানুষের তুলনায় বেশ ফর্সা। প্রায় তাদের মতোই মেয়েটার গায়ের রঙ। নামটা কী যেন মেয়েটার? গঙ্গা! গঙ্গা!... ভাবতে ভাবতে গ্লাস হাতে উঠে দাঁড়ান ম্যাকফারসন। ... সোফিয়া কি অপেক্ষা করবে তাঁর জন্য? করলে, কতদিন? তাঁরই বা কবে আর দেশে যাওয়া হবে? ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে ছাউনিটা থেকে বের হয়ে কারখানার দিকে রওয়ানা হন ম্যাকফারসন। হাঁটতে হাঁটতে একটা ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন ম্যাকফারসন।... গঙ্গাকে বিয়ে করবেন তিনি। ঘোমটা দিয়ে মেয়েটা যখন তাঁর খাবার পরিবেশন করে, লাজুক মেয়েটাকে অদ্ভূত সুন্দর লাগে। সোফিয়া হয়তো তাঁর পথ চেয়ে থেকে থেকে এতদিনে অন্য কারো হয়ে গেছে। সোফিয়ার ছায়াকে নিয়েই না হয় নতুন জীবন শুরু করবেন তিনি।
হঠাৎ চেঁচামেচির শব্দে কল্পনা ছুটে যায় ম্যাকফারসনের। ওজনাদারের ওখানে কী নিয়ে যেন লেগেছে। নাহ, এই কালো বাঞ্চোতরা শান্তি মতো একটু ভাবতেও দিবে না তাকে। চাবুকটা তার প্যান্টের সাথেই আটকানো থাকে। যেতে যেতে সেটা হাত দিয়ে স্পর্শ করেন তিনি। লাঠিয়াল তাঁর পিছে পিছে ঘোড়াটা নিয়ে আসছে। লাফ দিয়ে সেটার উপর চড়েই চিৎকার করে উঠেন তিনি।
এই কী নিয়ে এত চিৎকার করা হচ্ছে এখানে? শুনি!
জমিদার সৈয়দ আহমদ আলী আজকে নিজেও এসেছেন কারখানাতে। তিনি ঘোড়ার উপর উপবিষ্ট। আমিররা তাকে বেশ কয়েকবার বলেছে, ওজনদারদের শয়তানির কথা। ঘুষ না দিলে নাকি ওজনদার শেকলে বেশি বেশি নীল বেঁধে আঁটি করে। আর যারা ঘুষ দেয় তাদের ক্ষেত্রে সে শেকলে ঢিলেঢালাভাবে আঁটি বেধে দেয়।
ছোটসাহেবকে চিনেন না জমিদার আহমদ আলী। তবে সাহেবের বেশভূষায় তিনি সহজেই বুঝতে এই লোক নীলকুঠির বড় কেউ। জমিদার আহমদ আলী বলেন, সাহেব আমি শাহিজিল পরগনার জমিদার সৈয়দ আহমদ আলী।
টুমি জমিন্দার আছো? ওকে, কী নিয়ে গন্ডোগোল হচ্ছে এখানে বল আমাকে?
গন্ডোগোল করার কারণ তোমার কারখানার ওজনদার। সে আমার রায়তের কাছে ঘুষ চেয়েছে। বলেছে ঘুষ না দিলে নীলের মাপে হেরফের করবে।
গুস!
ঘুষ। মানে ব্রাইভ। ওজনদার নীলের গাছ ওজন করার সময় আমার রায়তের নীলের গাছ আলাদাভাবে ওজন করছে। অন্যদের গাছের চেয়ে আমার রায়তের গাছ বেশি নিচ্ছে। এর আগেও ওজনদার এই কাজ করেছে। রায়তরা আমাকে এই কথা বলাতে, আমি নিজে আজ কারখানায় এসেছি।
আলাদাভাবে বলটে কী বুঝাচ্ছো টুমি?
ওজনদারের দায়িত্ব হচ্ছে সবার নীল সমানভাবে ওজন করা। কিন্তু সে একটু আগে চেইনে যে পরিমাণ নীলের গাছ মেপেছে, আমার রায়তের নীল তারচেয়ে বেশি করে মেপেছে।
সেটা কীরূপে করেছে সে? ম্যাফারসন এতক্ষণে ব্যাপারটা বুঝতে পারেন। তবু তিনি প্রশ্নটা করেন।
মাপার সময় চেইন ঢিল দিলে কম নীলের গাছেই এক আঁটি হয়। আবার চেইন খুব টেনে বাঁধলে এক আঁটি হতে অনেক বেশি নীল লাগে। তোমার ওজনদার পয়সা দিলেই চেইনে ঢিল দেয়। একটু আগে একজন দুই আনা দিয়েছে, আমি নিজের চোখে দেখেছি।... আমার রায়ত এর প্রতিবাদ করলে, তাকে মারতে এসেছিল তোমার কারখানার কুলিরা। তাতে আমার আরো তিনজন রায়ত এগিয়ে এসেছে। তাতেই গন্ডোগোল। সাহেব তুমি উপস্থিত আছো, আমি জমিদার, সে যদি আমাদের সামনেই এমন কারচুপি করে, তবে আমাদের অনুপস্থিতে না জানি কী করে। তুমি এর বিচার করো।
টুমি কোন লাট-বাহাদুর আছো, যে টোমার কথায় আমি বিচার করবে। ম্যাকফারসন চাবুক হাতে নিয়ে বাতাসের গায়ে আঘাত করে। আমি ওজনদারের সাথে কথা বলিব আগে।
আমি কেন শুধু শুধু তোমাকে মিথ্যা কথা বলবো! জমিদার সৈয়দ আহমদ আলী অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে ম্যাফারসনের দিকে তাকান।
দেখি টুমি আমার সাথে আসো। আমি ওজনদারকে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করিব।
ম্যাকফারসন এগিয়ে যান। সকালের দিকে তিনি দেখেছেন ওজনদার শেকলে ঢিল দিয়ে গাছ ওজন করছে। নিশ্চয়ই এর বিনিময়ে সে পয়সা নিয়েছে। ... তবে পরে আবার শেকলে জোর দিয়ে সে গাছের হিসেব পুষিয়ে দিয়েছে, জানেন তিনি।
ওজনদারের কাছে গিয়ে ম্যাকফারসন ফের বাতাসের গায়ে চাবুক মারেন। বলেন, ওজনদার, টুমি নাকি এই জমিনদারের নীলের গাছ ওজন করার জন্য ব্রাইভ চেয়েছো?
কী চেয়েছি হুজুর। ঠিক বুঝতে পারলান না কো? ওজনদার জমিদার, আমির আর ম্যাকফারসনকে দেখে ব্যাপারটা কী আন্দাজ করতে পারছে। কিন্তু ব্রাইভ শব্দটার অর্থ সে নিশ্চিত বুঝতে পারছে না। তাই সে নিরপরাধের মতো মুখ করে জানতে চায়।
জমিদার সৈয়দ আহমদ আলী বলেন, তুমি একটু আগে আমার রায়তের কাছে ঘুস চাওনি? বলনি, আটি প্রতি দু আনা না দিলে নীলের আটি ঢিল করে বাধবে না?
কখন এই কথা বললাম আমি। জমিদার বাবু, আপনি শুধু শুধু আমাকে মিথ্যা অপবাদ দিবেন না।
এই, এবার আমির এগিয়ে আসে। তুই একটু আগে আমার কাছে ঘুষ চাইছিলি না।... সতীশ, রতন, সেলিম- ওরাও তো সাক্ষী আছে।
সতীশরা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। আমিরের কথায় তারা সায় জানায়। রতন বলে, তুমি আমাদের নীলের গাছ ওজন করার সময় পয়সা চেয়েছো। আমরা সকলেই শুনেছি।
ওজনদার অবাক স্বরে বলে, ছি ছি ছি! তোমরা সকলে মিলে আমার নামে মিথ্যে বলেছো তোমাদের জমিদারের নিকটে।... পরে সে ম্যাকফারসনকে উদ্দেশ্য করে বলে, হুজুর আমি আপনার গোলাম। আপনি তো আমাকে চিনেন। এমন কাজ আমি কত্তি পারি? এমন কাজ কল্লি চাষীরা আমাকে ছেড়ে কথা কইবে?
ম্যাকফারসন সৈয়দ আহমদ আলীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, দেখলে টো জমিনদার। টোমার রায়টরা ঝুট কথা বলেছে।
আমির ম্যাকফারসনের কথায় তেড়ে গিয়ে কিছু একটা বলতে চাইলে, আহমদ আলী হাত তুলে বাধা দেন।... থাক, আর কিছু বল না। এই ডাকাতদের কাছে বিচার চাওয়া না চাওয়া সমান কথা।
কী, টুমি আমাকে ডাকাট বললে? ম্যাকফারসন ক্ষেপে যান। আমি ডাকাট! আমরা ডাকাট? আমাদের কারণে টোমরা সভ্য হয়েছো, কাজ করটে পারছো। আমরা কট কট দূর থেকে টোমাদের দেশে এসে ইনভেস্ট করছি ব্যবসায়র জন্য। টুমি আমাকে ডাকাট বলিলে? ম্যাকফারসন জমিদার সৈয়দ আহমদ আলীকে মারার জন্য চাবুক উঠায়। চাবুক চালালে জমিদার সৈয়দ আহমদ আলী কিছুটা সরে যান। এতে তাঁর ঘোড়ার পেছনের পায়ে চাবুকের আঘাত লাগে।
জমিদার সৈয়দ আমির আলীর বয়স পঁয়ত্রিশের মতো। শক্তসমর্থ শরীর তাঁর। চাইলেই তিনি ম্যাকফারসনের কাছ থেকে চাবুক কেড়ে নিয়ে উল্টো তাকে মারতে পারেন। কিন্তু তিনি তা করলেন না। ঠান্ডা স্বরে বললেন, কাজটা তুমি ভালো করলে না সাহেব। তোমার কাছে একটা অন্যায়ের বিচার দিয়েছিলাম, তুমি উল্টো আরেকটা অন্যায় করলে। এর মাসুল তোমাকে দিতে হবে।
যাও যাও, আমার নামে আদালতে নালিশ করো। দেখি কোন পুলিশ আমাকে ধরতে আসে।
কারখানার সব শ্রমিক কাজ থামিয়ে ঘটনা দেখছিল। ম্যাফারসন তাদের ধমক লাগায়। শালা-বাঞ্চোত, টোমরা কাজ ফেলে কী মজা দেখছো। কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা একজনের গায়ে তিনি চাবুক দিয়ে আঘাত করেন। আঘাতে শ্রমিকটা মাটিতে শুয়ে পড়ে। অন্যরা দ্রুত যার যার কাজে লেগে পড়ে।
শ্রমিকরা চলে গেলে ম্যাকফারসন ওজনদারকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য বলে, কারখানা থেকে একটু দূরে একটা শাল গাছের তলে গিয়ে বসেন।
আমিররা কেউ ভাবতেও পারেনি ম্যাকফারসন এভাবে জমিদারের উপর চাবুক তুলবে। বাবু, আপনি কিছু বলবেন না? ম্যাকফারসন চলে গেলে সে জমিদারকে উদ্দেশ্য করে বলে।
এখন জবাব দেওয়ার সময় না। জমিদার সৈয়দ আহমদ আলী নিচু স্বরে বলেন। সময় মতো ঠিকঠাক জবাব দেবো। কারখানার সব শ্রমিক সাহেবের লোক। তারা আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে আমরা পারবো? ... এখন দেখো তোমাদের আনা নীলগাছের পয়সা দেয় কিনা। না দিলে আমি অই নীলের পয়সা দিবো তোমাদের। আমি এগুই। সামনের বটতলায় তোমাদের জন্য অপেক্ষা করবো।
ঘোড়া ছুটিয়ে জমিদার সৈয়দ আহমদ আলী কারখানা থেকে বের হয়ে যান।