জলটুঙি
বইয়ের সংক্ষিপ্ত কথা
বাগানটা বাড়ির পেছন দিকে। বাগানে বেশির ভাগই অল্পবয়সী মেহগনির গাছ। ফাঁকে ফাঁকে বট, খেজুর, নারিকেল গাছও আছে কিছু। সব গাছের প্রায় মাঝামাঝি বয়সী একটা বটগাছ। কলেজ থেকে ফিরে খাওয়া-দাওয়ার পর বটগাছটার তলে বসে আছে হেনা। বৈশাখের সুনসান দুপুর!
বসন্ত চলে গেলেও বিবশ বাতাসটা যেন রয়েই গেছে প্রকৃতিতে। থেকে থেকে উদাস হাওয়াটা তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। হাওয়ায় বাতাবিলেবু ফুলের মৃদু গন্ধ। সেই গন্ধে অকারণেই উন্মনা হয় হেনা। হঠাৎই তার ইচ্ছে হয়, সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়তে।
মাঝে মাঝে এমন ইচ্ছে হয় হেনার। যখন কিছুতেই আগ্রহ থাকে না, অথবা কারো সঙ্গই ভালো লাগে না—তখন তার সাইকেল নিয়ে পথে পথে ঘুরতে ইচ্ছে জাগে। প্যাডেলে পা রাখলেই মনে হয়, পৃথিবীটা তার সাইকেলের চাকার নিচে চলে এসেছে বুঝি।
রিভিউ
বইটির প্রথম কিছু অংশ পড়ে দেখুন
— প্রথম পরিচ্ছেদ —
আচমকা গ্যারেজ থেকে বের হয়ে দৌড়াতে শুরু করে হেনা...
বাগানটা বাড়ির পেছন দিকে। বাগানে বেশির ভাগই অল্পবয়সী মেহগনির গাছ। ফাঁকে ফাঁকে বট, খেজুর, নারিকেল গাছও আছে কিছু। সব গাছের প্রায় মাঝামাঝি বয়সী একটা বটগাছ। কলেজ থেকে ফিরে খাওয়া-দাওয়ার পর বটগাছটার তলে বসে আছে হেনা।
বৈশাখের সুনসান দুপুর!
বসন্ত চলে গেলেও বিবশ বাতাসটা যেন রয়েই গেছে প্রকৃতিতে। থেকে থেকে উদাস হাওয়াটা তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। হাওয়ায় বাতাবিলেবু ফুলের মৃদু গন্ধ। সেই গন্ধে অকারণেই উন্মনা হয় হেনা। হঠাৎই তার ইচ্ছে হয়, সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়তে।
মাঝে মাঝে এমন ইচ্ছে হয় হেনার। যখন কিছুতেই আগ্রহ থাকে না, অথবা কারো সঙ্গই ভালো লাগে না—তখন তার সাইকেল নিয়ে পথে পথে ঘুরতে ইচ্ছে জাগে। প্যাডেলে পা রাখলেই মনে হয়, পৃথিবীটা তার সাইকেলের চাকার নিচে চলে এসেছে বুঝি। পৃথিবীর আনাচে-কানাচে, যেখানে ইচ্ছে সাইকেল নিয়েই ঘুরতে পারে সে। ইচ্ছে হলেই বেল বাজাতে পারে ক্রিং ক্রিং।
তা ঘুরতোও হেনা। সুযোগ পেলেই সাইকেল নিয়ে গ্রামের পথে পথে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াত ক'দিন আগেও। কিন্তু এখন আর তেমন পারে না। স্বাধীনতা খর্ব হয়ে গেছে তার। মাস কয়েক আগের ঘটনাটার কারণে। হয়তো উপজেলার লোকেরা ভুলতে শুরু করেছে সে ঘটনা। কিন্তু ভুলেনি তার বাড়ির লোকেরা। ভোলেনি হেনা নিজেও। জীবনের অমন দুর্ঘটনা কোন মেয়েই-বা ভুলে যেতে পারে?
তাহলেও হেনা যে একেবারেই বাড়ি থেকে বের হয় না, তাও না। ইদানীং সাইকেল নিয়ে মাঝে মধ্যে বের সে হচ্ছে। তবে আগের মতো আর যেদিকে ইচ্ছে যায় না। ঘুরে বাড়ির আশেপাশেই। হেনার দাদি ফজিলত বলতো, মেয়ে মানুষের পায়ে নাকি জন্ম থেকেই শিকল বাঁধা থাকে। চাইলেও মেয়েরা সে শিকলের গণ্ডির বাইরে যেতে পারে না। এতদিন দাদির কথা ঠিক বিশ্বাস হতো না তার। কিন্তু এখন সে শিকলের অস্তিত্ব হেনা টের পায় বেশ ভালোভাবেই। নারীমাত্রই বোধহয় পদে পদে অনুভব করে শিকলের সীমাবদ্ধতা। পুরুষের পায়ে কোনো শিকল থাকে না। পুরুষ হলো মুক্ত চিল। বিপরীতে নারী হলো বাড়ির চৌহদ্দিতে ঘোরা মুরগি।
এলোমেলো ভাবনাতে মনটা বিষণ্ণই হয় হেনার। উদাস হাওয়াটা একটু জোরালো হয় হঠাৎ। মেহগনির দুটো-পাঁচটা ফুল ঝরে পড়ে তার গায়ে, মাথায়। কোথায় যেন করুণ সুরে একটা ঘুঘু ডেকে ওঠে। ফের সাইকেলটার কথা মনে পড়ে হেনার।
এখন সময়টা ঠিক ভালো নয়। যখন-তখন ঝড় আসে। তবু দোনোমনা করে সাইকেল নিয়ে বের হয় হেনা। বের হওয়ার সময় বাড়ির কেউ তাকে দেখে না। হালিমা বেগম দেখলে ঠিক বাধা দিতেন।
দ্রুত সাইকেল চালালেও পথ তেমন এগোয় না। রাস্তাটা মাটির। উঁচু-নিচু গর্ত পথ জুড়ে। সাইকেল চালাতে ভারী অসুবিধা হচ্ছে। হেনার বাবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। চাইলে তিনি এ রাস্তাটা পাকা করতে পারেন হয়তো। কিন্তু অন্য গ্রামের রাস্তা পাকার জন্য চেষ্টা করছেন তিনি। হেনা জানে। মাঝে মাঝে হেনা আজমীর কাজীর সাথে তাঁর কাজ-কাম নিয়ে কথা বলে। টুকটাক রাজনীতি নিয়েও কথা হয় বাপ-মেয়ের। বাবাকে কথায় কথায় দু-তিন বার বলেছে হেনা, আর সব রাস্তার আগে এই রাস্তাটা পাকা করার চেষ্টা করতে।
আজমীর কাজী তার কথা শুনে হেসেছেন। বলেছেন, 'অন্য গ্রামের রাস্তা বাদ দিয়ে এ রাস্তা পাকা করলে লোকে মন্দ বলবে মা। বলবে দেখো, চেয়ারম্যান হতে না হতেই নিজের বাড়ির পাশের রাস্তা পাকা করতে শুরু করেছে। আমাদের দিকে খেয়াল নেই। যারা ভোট দিয়ে আমাকে চেয়ারম্যান বানিয়েছে, তাদের কাজ আগে করা লাগেরে মা। তুই ছোট মানুষ, এসব কী বুঝবি! অত কিছু নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে মন দিয়ে পড়ালেখাটা কর তো। তোকে নিয়ে আমার অনেক আশা।'
আজমীর কাজীর সাথে যে ব্যাপারেই কথা হোক না কেন, কথা তাঁর শেষ হবে এক বক্তব্য দিয়েই—'তোকে নিয়ে আমার অনেক আশা।' শুধু কি বাবা? মা-বোনরাও হেনার কাছে কত কত আশা করে! তার নিজের যে কী ইচ্ছা, সে কথা কেউ জিজ্ঞেস করে না কখনো। বড় বোন সাজিয়াকে একবার বলতে গিয়েছিল সে—'বড় আপা, তোমরা যা চাও তা কেন হতে হবে? আমার নিজের কোনো ইচ্ছে থাকতে নেই?'
সাজিয়া অবাক হয়ে বলেছিল, 'তুই অই দিনের মেয়ে, তোর আবার ইচ্ছে-অনিচ্ছে কী? আর আমরা কি তোর মন্দ চাই?'
পাশেই বসা ছিলেন হালিমা বেগম। তিনি বলেন, 'সাজিয়া, জামাইদের বল এবার ভালো একটা ছেলে দেখতে। বিয়ে দিতে হবে না হেনার? তুই হেনার বয়সে এক ছেলের মা হয়ে গিয়েছিলি, আর হেনার বিয়েরই খবর নেই।'
'অই সব নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না আম্মা। সময়মতো তোমার জামাইরা হেনার জন্য ছেলে খুঁজবে। আমাদের হেনা হলো বিশ্বসুন্দরী। তার জন্য যেই-সেই জামাই হলে হবে? ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ লাগবে।'